অপেক্ষা নিয়ে কষ্টের গল্প: সেরা ৫টি ছোট গল্প ২০২৬

জীবনের সব গল্পের শেষটা মিলন দিয়ে হয় না; কিছু গল্প কেবল অন্তহীন অপেক্ষার চাদরে মোড়ানো থাকে। প্রিয় মানুষটি আসবে বলে দিনের পর দিন পথ চেয়ে থাকার যে যন্ত্রণা, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, দিন গড়িয়ে রাত হয়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই মানুষটি আর ফেরে না। আপনি কি অপেক্ষা নিয়ে কষ্টের গল্প পড়তে ভালোবাসেন কিংবা নিজের জীবনের কোনো অসম্পূর্ণ অধ্যায়ের সাথে মিল খুঁজছেন? তাহলে আজকের এই আয়োজন আপনার জন্যই। এখানে আমরা সাজিয়েছি হৃদয় নিংড়ানো সেরা ৫টি ছোট গল্প, যার প্রতিটি ছত্রে মিশে আছে হাহাকার আর না পাওয়ার বেদনা।

ট্রেনের হুইসেল আর না ফুরানো বিকেল (গল্প ১)

কমলাপুর স্টেশনের ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মের ঠিক মাঝখানের সিমেন্টের বেঞ্চটার গায়ে অনেক বছরের পুরোনো আঁচড়। রাশেদ সাহেব সেই আঁচড়ের ওপর হাত বুলিয়ে বসে আছেন। ঘড়িতে সময় বিকেল ৫টা বেজে ১০। ‘গোধূলি এক্সপ্রেস’ আসার কথা ছিল ৪টায়। মাইকে যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ বারবার জানিয়ে দিচ্ছে—”ট্রেনটি বিলম্বে আসিতেছে।”

রাশেদ সাহেবের কাছে এই বিলম্ব নতুন কিছু নয়। গত তিন বছর ধরে প্রতি শুক্রবার তিনি এখানে আসেন। তাঁর মেয়ে তিশা হারিয়ে গিয়েছিল এমনই এক ভিড়ের মধ্যে। পুলিশ বলেছিল, “খুঁজে পাওয়া যাবে, অপেক্ষা করুন।” সেই থেকে রাশেদ সাহেব স্টেশনে আসেন। ট্রেন আসে, যাত্রীরা নামেন। প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য, লাগেজ টানা কুলি, হকারের চিৎকার—সবই এক থাকে, শুধু তিশা থাকে না।

সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। সিগন্যাল বাতি লাল থেকে সবুজ হলো। দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। রাশেদ সাহেবের বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক ছন্দে কেঁপে ওঠে। ঝাপসা চোখে তিনি গেটের দিকে তাকান। হাজারো মুখের ভিড়ে তিনি একটি পরিচিত মুখ খুঁজছেন। ট্রেন থামল, মানুষ নামল, আবার প্ল্যাটফর্ম খালি হয়ে গেল।

সন্ধ্যা নামছে। স্টেশনের নিওন আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। রাশেদ সাহেব ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। আজকের মতো অপেক্ষা শেষ, কিন্তু ফুরোল না। পকেটে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “আগামী শুক্রবার হয়তো…”।

লাস্ট সিন এবং টাইপিং… (গল্প ২)

রুমের সব আলো নেভানো, শুধু ফোনের স্ক্রিনের নীলাভ আলোটা আবিরের মুখের ওপর স্থির হয়ে আছে। রাত ২টা ৩৭ মিনিট। হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটবক্সটা খোলা। ওপাশে নাম লেখা ‘নিরা’। নামের নিচে ছোট করে লেখা—Online.

আবিরের আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর থমকে আছে। একটা মেসেজ লিখছে, আবার মুছে ফেলছে। “জেগে আছো?”—না, এটা বড্ড সাধারণ শোনায়। “কথা ছিল…”—না, এটা অভিযোগের মতো শোনায়। হঠাৎ করেই নিরার নামের নিচে দেখা গেল—Typing…

আবিরের শ্বাস আটকে আসে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এসেছে। ওপাশে কী লিখছে নিরা? কোনো কৈফিয়ত? নাকি সেই চূড়ান্ত শব্দ—”বিদায়”? তিনটে ছোট বিন্দু নাচছে স্ক্রিনে। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড…।

হঠাৎ Typing… লেখাটা মিলিয়ে গেল। কোনো মেসেজ এল না। স্ট্যাটাসটা আবার Online হলো, আর তার ঠিক এক মিনিট পর—Last seen today at 2:41 AM.

আবির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই রইল। কোনো শব্দ নেই, কোনো উত্তর নেই। ভার্চুয়াল এই নীরবতা যে কতটা চিৎকার করে কাঁদতে জানে, তা কেবল আবিরের বালিশটা জানে। ওই তিনটে বিন্দুর নড়াচড়া যে এতটা যন্ত্রণার হতে পারে, তা কে জানত?

চিঠির ভাঁজে জমানো দীর্ঘশ্বাস (গল্প ৩)

সুফিয়া বানুর টিনের ট্রাংকটা খুললেই ন্যাপথলিন আর পুরোনো কাগজের একটা ভ্যাপসা গন্ধ বের হয়। তিনি কাঁপা হাতে নীল খামটা বের করেন। খামের ওপরের কালচে হয়ে যাওয়া ডাকটিকেটটা এখনো অক্ষত। তারিখটা ১৯ শে শ্রাবণ, ১৩৯৮ সাল।

চিঠির ভাঁজগুলো খুলতে গেলে কাগজ ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় হয়, এতটাই জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। তবু তিনি পড়েন। চিঠিতে লেখা—”সুফি, বর্ষা শেষেই আসছি। শিউলি তলায় দেখা হবে।”

বর্ষা শেষ হয়েছে বহুবার, শিউলি ফুল ঝরে পথ ছেয়ে গেছে, কিন্তু চিঠি লেখক আর আসেননি। গ্রামের সেই কাঁচা রাস্তা এখন পিচঢালা পথ হয়েছে। এখন আর কেউ চিঠির জন্য অপেক্ষা করে না, সবার হাতে হাতে মোবাইল। তবু, দুপুরের অলস সময়ে উঠোনে সাইকেলের বেল বাজলে সুফিয়া বানু চমকে ওঠেন। দৌড়ে দরজার কাছে যান।

না, পিওন আসেনি। পাশের বাড়ির কোনো বাচ্চার সাইকেল। সুফিয়া বানু আবার ফিরে আসেন। নীল খামটা বুকে জড়িয়ে ধরেন। কাগজের ওপর তাঁর চোখের জল পড়ে, কালির অক্ষরগুলো আরও একটু অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই অপেক্ষা ফুরোবার নয়, এই চিঠি শুধুই পড়ার জন্য, উত্তর দেওয়ার ঠিকানাটা যে হারিয়ে গেছে বহুকাল আগেই।

বৃদ্ধাশ্রমের জানালা ও ঝাপসা চোখ (গল্প ৪)

‘ছায়াবীথি’ বৃদ্ধাশ্রমের দোতলার কোণার ঘরটা থেকে মেইন গেটটা পরিষ্কার দেখা যায়। আসজাদ সাহেব সারাদিন হুইলচেয়ারে বসে সেই গেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আজ ঈদ। সকাল থেকে গেট দিয়ে অনেক গাড়ি ঢুকছে। চকচকে জামা পরা বাচ্চারা আসছে দাদু-দিদাকে দেখতে।

আসজাদ সাহেবের ছেলে আমেরিকায় থাকে। গত সপ্তাহে ফোনে বলেছিল, “বাবা, এবার ঈদে খুব কাজের চাপ, আসতে পারব না। টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি, ভালো কিছু খেয়ে নিও।”

টাকা দিয়ে কি একাকিত্ব কেনা যায়? আসজাদ সাহেব জানালার গ্রিলটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেন। গেট দিয়ে একটা কালো গাড়ি ঢুকছে। ঠিক তাঁর ছেলের গাড়ির মতো। তাঁর ঝাপসা চোখে এক মুহূর্তের জন্য আশার আলো জ্বলে ওঠে। তিনি শরীরটা একটু সামনে ঝুঁকিয়ে দেন। গাড়িটা থামল। না, অন্য কেউ।

পাশে রাখা চশমাটা তিনি আর পরেন না। ঝাপসা চোখেই পৃথিবীটা দেখতে ভালো লাগে এখন। স্পষ্ট দেখলে বড্ড কষ্ট হয়। তিনি মনে মনে বলেন, “খোকা, তুই ব্যস্ত থাক। আমি শুধু জানালার গ্রিলটা ধরে বসে আছি, যদি ভুল করেও কোনো দিন পথ ভুলে চলে আসিস।”

সূর্য ডুবে যাচ্ছে। বৃদ্ধাশ্রমের করিডোরে হাসির শব্দ, কিন্তু আসজাদ সাহেবের ঘরে শুধুই দীর্ঘশ্বাস আর জানালার ওপাশে মিলিয়ে যাওয়া রাস্তার ধূসর রেখা।

ফিরবো বলে আর না ফেরার গল্প (গল্প ৫)

“এই তো, দুটো বছর। বাড়িটা কমপ্লিট করেই আমি চলে আসব।”—বিমানবন্দরের লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলেছিল রিয়াজ। সালমা তখন আঁচল দিয়ে মুখ চেপে কান্না লুকাচ্ছিল।

সেই ‘দুটো বছর’ গড়িয়ে এখন বারো বছর। গ্রামের টিনের ঘরটা এখন দোতলা দালান হয়েছে। ঘরে দামী সোফা, বড় টিভি, এসি—সব হয়েছে। কিন্তু যেই মানুষটার জন্য এই আয়োজন, সেই মানুষটাই নেই।

রিয়াজ প্রতিবারই বলে, “আর কটা দিন, ভিসাটা রিনিউ করে ফেলি।” সালমা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চুলের গোড়ায় পাক ধরেছে, চোখের নিচে কালি। বিয়ের বেনারসি শাড়িটা আলমারিতে ভাঁজ করা অবস্থাতেই রং চটে গেছে।

সেদিন রিয়াজের ফোন এল। সালমা ধরল না। কী হবে কথা বলে? সেই তো একই আশ্বাস, একই মিথ্যে স্বপ্ন। সালমা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আকাশে একটা প্লেন উড়ে যাচ্ছে, সাদা একটা রেখার মতো দাগ ফেলে। সালমা তাকিয়ে থাকে। মানুষটা ফিরবে না, ফিরবে শুধু রেমিট্যান্স। প্রতিশ্রুতিগুলো এখন পাথরের মতো ভারী হয়ে বুকের ওপর চেপে বসেছে। জীবিত মানুষের জন্য অপেক্ষা করাটা যে মৃত মানুষের জন্য শোক করার চেয়েও কঠিন, তা সালমা এখন বোঝে।

অপেক্ষা নিয়ে কিছু কথা

অপেক্ষা হলো মানুষের মনের এক অদ্ভুত পরীক্ষাগার। এটি আমাদের ধৈর্য শেখায়, কিন্তু বিনিময়ে চুষে নেয় জীবনের অনেকটা সময়। গল্পের চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও, তাদের যন্ত্রণাগুলো আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি।

জীবনের কঠিনতম সত্য হলো—সব অপেক্ষার শেষটা মিলন দিয়ে হয় না। কিছু অপেক্ষা সারা জীবন শুধু অপেক্ষাই থেকে যায়। স্টেশনের বেঞ্চ, ফোনের স্ক্রিন, চিঠির খাম কিংবা বৃদ্ধাশ্রমের জানালা—পটভূমি যা-ই হোক, অপেক্ষার রং সবসময় ধূসর।

তবু মানুষ অপেক্ষা করে। কারণ, আশা মানুষের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। তবে এটাও মনে রাখা জরুরি, যে অপেক্ষা আপনাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে, যে দরজা খোলার কোনো সম্ভাবনা নেই, সেই দরজার সামনে থেকে সরে আসাই হয়তো বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। নিজেকে ভালো রাখার দায়িত্বটা দিনশেষে নিজেরই। স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু জীবনটা স্মৃতির চেয়েও বড়।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *